মাস্ক বনাম অল্টম্যান ট্রায়াল
4 min read 20 views

মাস্ক বনাম অল্টম্যান ট্রায়াল

টেক দুনিয়ায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যে নাটকটা চলছে, তা কোনো টানটান উত্তেজনার সিনেমা বা ওয়েব সিরিজকেও হার মানাবে। হ্যাঁ, আমি সিলিকন ভ্যালির দুই মহারথী—ইলন মাস্ক এবং স্যাম অল্টম্যানের মধ্যকার সেই বহুল আলোচিত আইনি লড়াইয়ের কথা বলছি। ওকল্যান্ডের আদালতে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলা এই ঐতিহাসিক ট্রায়ালের সমাপনী যুক্তি (Closing arguments) শেষ হয়েছে, আর এখন পুরো এআই (AI) কমিউনিটি জুরির রায়ের অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে বসে আছে।

বিবিসি-র সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে এই মামলার ভেতরের কিছু চাঞ্চল্যকর এবং কিছুটা ‘কুৎসিত’ সত্য সামনে এসেছে। একজন এআই এনথুসিয়াস্ট হিসেবে এই ট্রায়াল থেকে আমরা কী জানতে পারলাম, আর এটি আমাদের এআই-এর ভবিষ্যৎকে কীভাবে বদলে দিতে পারে—তা নিয়েই আজকের এই ব্লগ। চলুন, ৫টি মূল পয়েন্টে পুরো ব্যাপারটা সহজ করে বোঝা যাক।

১. টাকা নাকি আদর্শ? নন-প্রফিট বনাম ৮৫০ বিলিয়ন ডলারের কর্পোরেট জায়ান্ট

মামলার একদম মূলে রয়েছে একটা বড় আদর্শিক প্রশ্ন। ২০১৫ সালে যখন ওপেনএআই (OpenAI) তৈরি হয়, ইলন মাস্ক সেখানে প্রায় ৩৮ মিলিয়ন ডলার ফান্ড দিয়েছিলেন এই শর্তে যে, এটি একটি অলাভজনক (Non-profit) প্রতিষ্ঠান হিসেবে মানবতার কল্যাণে কাজ করবে এবং এর তৈরি টেকনোলজি হবে সবার জন্য উন্মুক্ত বা ‘ওপেন-সোর্স’। কিন্তু ২০১৯ সালের পর জিপিটি (GPT)-র অভাবনীয় সাফল্যের হাত ধরে ওপেনএআই রাতারাতি ফর-প্রফিট (লাভজনক) সংস্থায় রূপ নেয়, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৮৫০ বিলিয়ন ডলার! মাস্কের দাবি, অল্টম্যান ও গ্রেগ ব্রকম্যান তাঁর টাকা এবং বিশ্বাসের অবমাননা করেছেন। অন্যদিকে, ওপেনএআই-এর যুক্তি—গুগল বা অন্যান্য জায়ান্টদের সাথে টেক্কা দিতে গেলে যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও কম্পিউটিং পাওয়ার লাগে, তা নন-প্রফিট মডেলে থেকে জোগাড় করা অসম্ভব ছিল।

২. কোনো লিখিত চুক্তিই ছিল না! সব চলছে পুরোনো ইমেইলের ওপর

শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি, মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী যে এআই মিশনের সূচনা হয়েছিল, তার পেছনে মাস্ক আর অল্টম্যানের কোনো অফিশিয়াল বা আইনি চুক্তিপত্র (Formal Contract) সই করা ছিল না! মাস্কের আইনজীবীরা আদালতে প্রমাণ হিসেবে তাঁদের পুরোনো ইমেইল চালাচালি, ওয়েবসাইটের প্রাচীন কিছু স্টেটমেন্ট আর বিভিন্ন প্রেস ইন্টারভিউ দেখিয়েছেন। তাঁরা বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে, এই ইমেইলগুলোই এক ধরনের ‘পবিত্র বিশ্বাস বা চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’ তৈরি করেছিল। একজন ডেভেলপার বা টেক এনথুসিয়াস্ট হিসেবে এটা ভাবাই যায় না যে, এত বড় একটা প্রজেক্ট কোনো সলিড লিগ্যাল কন্ট্রাক্ট ছাড়াই শুধু মুখের কথা আর ইমেইলের ওপর ভর করে বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্যে রূপ নিয়েছে!

৩. বিলিয়নেয়ারদের কাদা ছোঁড়াছুড়ি ও ‘মিথ্যুক’ তকমা

কোর্টে যেভাবে একে অপরের প্রতি কাদা ছোঁড়াছুড়ি হয়েছে, তা এককথায় নজিরবিহীন। মাস্কের আইনজীবী সরাসরি স্যাম অল্টম্যানের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং আদালতে এমন ৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দি টেনেছেন যারা অল্টম্যানকে শপথ নেওয়া অবস্থায় ‘মিথ্যুক’ (Liar) বলে ডেকেছেন। অন্যদিকে, ওপেনএআই-এর আইনজীবীরা মাস্ককে এক হিংসুটে ও প্রতিশোধপরায়ণ ব্যক্তি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন, যিনি নিজে ওপেনএআই-এর বাণিজ্যিক সত্তার নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হয়ে এখন তাদের ক্ষতি করতে চাচ্ছেন। এমনকি মাস্কের সন্তানদের মা শিবন জিলিসকেও (যিনি এই দুই পক্ষের মাঝে একসময় মধ্যস্থতাকারী ছিলেন) কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিতে হয়েছে। টেক দুনিয়ার পর্দার পেছনের এই নোংরা রাজনীতি দেখে সত্যিই একটু ধাক্কা খেতে হয়।

৪. আইনের মারপ্যাঁচে আটকে থাকা 'টাইমিং'

জুরির সামনে এখন সবচেয়ে বড় টেকনিক্যাল প্রশ্ন হলো টাইমিং বা আইনি সময়সীমা (Statute of Limitations)। মাস্ক ২০১৮ সালে ওপেনএআই ছাড়েন এবং ওপেনএআই ২০১৯ সালে ফর-প্রফিট মডেলে যায়। কিন্তু মাস্ক মামলা করেছেন ২০২৪ সালে। ওপেনএআই-এর দাবি, মাস্ক অনেক বেশি দেরি করে ফেলেছেন, আইনত এই মামলার মেয়াদ অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। জুরি যদি মনে করে মাস্ক সময়মতো মামলা করেননি, তবে কেসটা ওখানেই খারিজ হয়ে যাবে। কোটি কোটি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলা একটা টেকনোলজির ভবিষ্যৎ এখন স্রেফ আইনের একটা ডেট-লাইন বা মারপ্যাঁচে আটকে আছে।

৫. এআই ইকোসিস্টেমে সম্ভাব্য ভূমিকম্প: আমাদের কী হবে?

একজন এআই লাভার হিসেবে এই পয়েন্টটাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই মামলার রায় যদি ইলন মাস্কের পক্ষে যায়, তবে ওপেনএআই-এর জন্য তা হবে এক বিশাল বিপর্যয়। জাজ যদি নির্দেশ দেন যে ওপেনএআই-কে আবার পুরোপুরি নন-প্রফিট হতে হবে, তবে তাদের আসন্ন আইপিও (IPO) পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। মাইক্রোসফট (যারা ১৩ বিলিয়ন ডলার ইনভেস্ট করেছে), অ্যামাজন বা সফ্টব্যাংকের মতো বড় বড় ইনভেস্টরদের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করতে হতে পারে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়বে আমাদের ওপর। ওপেনএআই যদি ফান্ডিং সংকটে পড়ে, তবে চ্যাটজিপিটি (ChatGPT)-র ডেভেলপমেন্ট থমকে যেতে পারে। তবে এর একটা দারুণ পজিটিভ দিকও আছে—ওপেনএআই যদি আদালতের নির্দেশে আবার ওপেন-সোর্স মডেলের দিকে ফিরে যেতে বাধ্য হয়, তবে বিশ্বজুড়ে ওপেন-সোর্স এআই কমিউনিটির এক অভূতপূর্ব জয় হবে। তবে এই ডামাডোলের সুযোগে অ্যানথ্রোপিক (Anthropic), গুগল (Google) বা চীনের ডিপসিক (DeepSeek)-এর মতো প্রতিদ্বন্দীরা আরও দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।

শেষ কথা: দিনশেষে, এই যুদ্ধটা শুধু ইলন মাস্ক আর স্যাম অল্টম্যানের ব্যক্তিগত অহংকারের লড়াই নয়; এটা আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের লড়াই। এআই কি শুধু গুটিকয়েক কর্পোরেট জায়ান্টের ক্লোজড-সোর্স ও একচেটিয়া ব্যবসার হাতিয়ার হবে, নাকি এটি ওপেন-সোর্স হিসেবে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে—তার অনেকখানিই নির্ভর করছে এই রায়ের ওপর।

আপনাদের কী মনে হয়? ওপেনএআই-এর এই কর্পোরেট রূপান্তর কি প্রযুক্তির অগ্রগতির জন্য দরকারি ছিল, নাকি মাস্কের ওপেন-সোর্সের দাবিটাই সঠিক? কমেন্ট সেকশনে আপনাদের মতামত জানান!